অন্ধকারের ডাক
রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা । চারদিকে এমন নিস্তব্ধতা , যেন পৃথিবীটা থমকে গেছে ।শুধু দূরে কোথা ও ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক আর মাঝে মাঝে বাতাসে পাতার খসখস শব্দ ।
রাহুল আর তার বন্ধু সৌরভ, দু'জনেই অ্যাডভেঞ্চারের নেশায় মত্ত। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, গ্রামের পাশের সেই “অভিশপ্তজঙ্গল” – এ রাত কাটাবে । গ্রামবাসীরা অনেক বার নিষেধ করেছিল –
“ওই জঙ্গলে রাতে গেলে কেউ ফেরেনা ……..”
কিন্তু কে শোনে কার কথা !
জঙ্গলের ভিতর
জঙ্গলের ভেতরে ঢুকতেই মোবাইলের নেটওয়ার্ক হারিয়ে গেল ।চাঁদের আলোও গাছের ঘন পাতার আড়ালে ঢুকে পড়তে পারছে না ।
হঠাৎ ………
টপ ….. টপ ….. টপ ….
কোথাও যেন পায়ের শব্দ ।
“শুনলি ?” – সৌরভ ফিসফিস করে বলল ।
“হয়তো কোনো জন্তু ……” – রাহুল বলল, কিন্তু তার গলায় স্পষ্ট ভয় ।
তারা টর্চ জ্বালাল । আলো পড়তেই সামনে দেখা গেল একটা পুরনো ভাঙা কুঁড়েঘর ।
কুঁড়েঘর:-
ঘরের দরজাটা আধখোলা । ভেতর থেকে ঠান্ডা হাওয়া বেরোচ্ছে ।
“চল ভেতরে যাই ……” – রাহুল বলল ।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই –
কড়াৎ !!!
দরজাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল ।
হঠাৎ দেওয়ালে দেখা গেল একটা ছায়া …… কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় –
ওটা তাদের ছায়া নয় !
অন্ধকারের চোখ :-
ধীরে ধীরে সেই ছায়াটা নড়তে শুরু করল ।
তারপর …..
দুটি লাল চোখ জ্বলে উঠল অন্ধকারে ।
“তোমরা …. কেন এসেছো …..”
একটা কর্কশ, ভাঙা গলা ।
সৌরভ চিৎকার করে দরজা খুলতে গেল, কিন্তু দরজা যেন পাথরের মতো শক্ত ।
রাহুল কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আমরা … আমরা চলে যাচ্ছি ……”
কিন্তু সেই গলা আবার শোনা গেল –
“এখানে যারা আসে …… তারা আর ফেরেনা ….”
শেষ মুহূর্ত:-
হঠাৎ টর্চ নিভে গেল।
চারদিকে শুধু অন্ধকার ……. আর সেই চোখ দুটি আরও কাছে আসছে …….
তারপর ……
সবচুপ ।
পরের সকাল :-
পরদিন সকালে গ্রামের কয়েকজন লোক জঙ্গলে ঢুকে হাজির হল কুঁড়েঘরের সামনে ।
তখন সবার মুখে একই প্রশ্ন –
রাহুল আর সৌরভ কোথায় গেল?
তারা শুধু একটা জিনিস পেল –
ভাঙা কুঁড়েঘরের সামনে পড়ে আছে দুটো টর্চ ……
আর মাটিতে আঁচড়ানো একটা শব্দ –
“ওটা এখনও এখানে আছে ……”
-দেখে সবার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল ।
অদৃশ্য পায়ের চিহ্ন :-
গ্রামের এক বৃদ্ধ, নাম হরিপদকাকু, ধীরে ধীরে বললেন –
“আমি জানতাম ……. আবার শুরু হয়েছে …..”
তিনি মাটির দিকে ইশারা করলেন ।
সেখানে হালকা পায়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে –
কিন্তু রহস্য জনক ব্যাপার হল, ছাপগুলো হঠাৎ করেই মাঝপথে গিয়ে উধাও !!!
“ ওরা হাঁটতে হাঁটতেই ….. হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে ?” – এক যুবক ভয়ে বলল ।
পুরনো রহস্য :-
হরিপদকাকু গল্প শুরু করলেন –
“ এই জঙ্গলে বহু বছর আগে এক সাধু থাকতেন । লোকেরা বলে, তিনি কালোশক্তির সাধনা করতেন ।একরাতে গ্রামবাসীরা তাকেমারতে যায় …….. আর সেদিন থেকেই এই অভিশাপ । “
“সেই সাধুর আত্মা এখনো এখানে ঘোরে ………… আর নতুন মানুষ পেলেই তাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যায় ………”
সন্ধ্যার অভিযান :-
রাহুল আ রসৌরভকে খুঁজে বের করতে, কয়েকজন যুবক সিদ্ধান্ত নিল –
আজ রাতে আবার জঙ্গলে ঢুকবে ।
তাদের সঙ্গে হরিপদকাকুও গেলেন ।
রাত নামতেই, আবার সেই জঙ্গল …….
আবার সেই অস্বাভাবিক নীরবতা ……..
হঠাৎ -
ফিসফিস ….. ফিসফিস …….
কেউ যেন নাম ধরে ডাকছে –
“রাহুল ……….সৌরভ ………”
ফিরে আসা ……. নাকি কিছু অন্য ?
কুঁড়ে ঘরের সামনে পৌঁছতেই, তারা দেখতে পেল –
দু'জন লোক দাঁড়িয়ে আছে ।
রাহুল ……… আর সৌরভ !!!!!!!
কিন্তু ……….
তাদের চোখ সম্পূর্ণ কালো ……….
মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই ……….
“ আমরা ……… ফিরে এসেছি …..” – তারা একসঙ্গে বলল ।
হরিপদকাকু চিৎকার করে বললেন –
“ না !!!! ওরা মানুষ নেই !!!! দৌড়াও !!!”
কিন্তু তখন দেরি হয়ে গেছে …….
রাহুল আর সৌরভ ধীরে ধীরেএ গিয়ে আসছে ……
তাদের মুখে এক বিচ্ছিরি হাসি ……
তারপর হঠাৎ -
সবাই শুনতে পেল সেই একই গলা –
“এখন ….. তোমরাও থাকবে …..”
কয়েকদিন পরে …….
গ্রামের লোকেরা আর কখনো ওই জঙ্গলের দিকে যায় না ।
কারণ মাঝে মাঝে, গভীর রাতে ………
জঙ্গলের ভেতর থেকে শোনা যায় –
অনেকগুলো কন্ঠ একসঙ্গে ডাকছে …….
“এদিকে এসো ……..”
এরপর কেটে গেল বেশকিছু মাস ।
গ্রামটা এখন প্রায় জনশূন্য । সূর্য ডুবলেই সবাই দরজা -জানলা বন্ধ করে দেয় ।
কারণ তারা জানে –
ওটা এখন শুধু জঙ্গলে নেই …… ওটা ছড়িয়ে পড়ছে।
শেষ আশ্রয়:-
গ্রামের স্কুল শিক্ষক, অমলেন্দুবাবু, আর সহ্য করতে পারলেন না ।
তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন –
এই রহস্যের শেষ আজই করতে হবে ।
তিনি শহর থেকে ডেকে আনলেন এক তান্ত্রিক –
নাম তার কালীচরণ তান্ত্রিক ।
কালীচরণ জঙ্গলের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন –
“এটা সাধারণ ভূত নয় …… এটা এক শক্তি, যাকে কেউ জাগিয়ে তুলেছে …… আর এখন সে শরীর খুঁজছে ….. ”
মুখোমুখি :-
রাত বারোটায় তারা কুঁড়েঘরের সামনে পৌঁছলো ।
চারদিকে আগুনের বৃত্ত আঁকা হলো , মন্ত্রপড়া শুরু হলো ।
হঠাৎ -
হাওয়া থেমে গেল ।
পাখিরা চুপ ।
তারপর …..
অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এলো …..
রাহুল, সৌরভ …… আর গ্রামের সেই হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো ।
তাদের চোখ কালো, মুখ ফ্যাকাশে ……..
সবাই একসঙ্গে বলল –
“ওকে থামাতে পারবে না ……..”
আসল রূপ :-
কুঁড়েঘরটা হঠাৎ ভেঙে পড়ল ।
ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো এক বিশাল ছায়া –
মানুষ নয় ……… জন্তু নয় ……..
শুধু অন্ধকার …..
কালীচরণ চিৎকার করে মন্ত্র পড়তে লাগলেন –
“ ওঁ কালিকায় নমঃ ….. ”
ছায়াটা গর্জে উঠল –
“আমি ফিরে এসেছি …… তোমরা আমাকে থামাতে পারবে না ………”
শেষ লড়াই :-
মন্ত্রের শক্তিতে ছায়াটা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে লাগল ।
চারদিকে আগুন জ্বলে উঠল, মাটি কাঁপতে লাগল ।
কালীচরণ শেষ শক্তি দিয়ে বললেন –
“এই শক্তিকে আবার বন্ধ করতে হলে ……. একজনকে আত্মবলিদান দিতে হবে ……..”
আত্মবলিদান !!!!!
চমকে উঠল সেখানে উপস্থিত সকলে । কে নিজের প্রাণত্যাগ করবে ……. তা ভেবে সকলে ভয়ে যখন পিছিয়ে যাচ্ছ ……
অমলেন্দুবাবু এক মুহূর্ত দেরি করলেন না ।
“ আমি প্রস্তুত ……”
সমাপ্তি ….. নাকি শুরু?
এক ঝলক আলো ……..
এক ভয়ঙ্কর চিৎকার ……..
সবকিছু হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল ।
জঙ্গল আবার নিস্তব্ধ ।
কয়েক মাস পরে ……..
গ্রামটা ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করল ।
কেউ আর কোনো শব্দ শোনেনা ……..
কিন্তু ……
একদিন, এক নতুন পর্যটক জঙ্গলের পাশে দাঁড়িয়ে দেখল –
মাটিতে লেখা আছে –
“দরজা আবার খুলছে ……..”
শেষ কথা :-
অন্ধকার কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না ……..
সে শুধু অপেক্ষা করে –
আবার কেউ তাকে ডাকবে ……………
-: THE END :-
[যদি আমার লেখা এই গল্পটি আপনাদের ভালো লাগে, তাহলে আমার এইPage টিSubscribe করতে ভুলবেন না ।
আর আপনাদের দেওয়াTips আমাকে আরও নতুন নতুন গল্প লিখতে উৎসাহ যোগাবে। ধন্যবাদ জানাই সকলকে। আপনারা ভালো থাকবেন ও সুস্থ থাকবেন । নমস্কার ।]



