বিকেলবেলা, অন্ধকার হবার কিছু আগেই, ছোট্ট গ্রাম গোপালপুরে একটা অদ্ভুত কোলাহল শুরু হলো। গ্রামের মানুষজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল, এই ধরনের অস্বাভাবিকতা তো তাদের অভ্যস্ত নয়। পুরনো ভিটের সামনে পায়ের হালকা শব্দ ও ভেতরে ভেতরে অশান্তি ছড়িয়ে পড়ছিল। মানুষের মনে অশান্তি দেখা দিল।
গ্রামের প্রাচীন তান্ত্রিক বাবা মিঠু চরণের কাছে কেউ কেউ আসছিল এবং অভ্যন্তরীণ আতঙ্কের কারণ জানার চেষ্টা করছিল। বাবা মিঠু চরণ অতি প্রাচীন আর একধরনের দার্শনিক, যার কথার মধ্যে গভীরতা ও গম্ভীরতা ছিল। তিনি নিজেদের বিশ্বাসকে একক ভাবে রেখেছিলেন এবং যে কোনো ধরনের অশান্তি দেখলে সেই জিনিসের রহস্যের দিকে মনোযোগ দিতেন।
এই সময়ে, গ্রামের একটি প্রাচীন মন্দিরে পুজো চলছিল। ওই মন্দিরটি অনেক পুরোনো এবং সেখানকার পাথরের উপর ভাস্কর্য ও অঙ্কনগুলির মধ্যে গাঢ় অন্ধকার ও রহস্যপূর্ণ কিছু ছিল। পুজোর মধ্যে মাঝে মাঝে অদ্ভুত ধ্বনি ও সুর শোনা যাচ্ছিল, যা গ্রামের লোকদের মধ্যে ভয় তৈরি করছিল।
একদিন, গ্রামের এক যুবক শ্যামলকে দেখে বাবা মিঠু চরণ বললেন, “শোনো, শ্যামল, আমার মনে হচ্ছে কিছু অশুভ চিহ্ন এই গ্রামে প্রবেশ করেছে। তোমার উচিত মন্দিরের ভেতরের অবস্থা পরীক্ষা করা। তবে সাবধান থেকো।”
শ্যামল মন্দিরে গেল এবং সেখানকার এক কোণে একটি পুরানো পাথরের বাক্স দেখতে পেল। বাক্সটি মাটি দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল এবং তার উপর কিছু অদ্ভুত অঙ্কন করা ছিল। সে বাক্সটি খুলতে যাচ্ছিল, তখনই হঠাৎ একটা অদ্ভুত সুর শোনা গেল। সেই সুরটি এমন ছিল, যেন কোন অদৃশ্য সত্তা তাকে ডাকছে।
শ্যামল ভীত হয়ে পাথরের বাক্সটি খুলল এবং তার ভেতরে একটি প্রাচীন গ্রন্থ পেল। গ্রন্থটির পৃষ্ঠাগুলি পচে গিয়েছিল, কিন্তু কিছু অংশ পড়া সম্ভব হচ্ছিল। গ্রন্থের লেখা ছিল “প্রাণের অন্ধকার ও রহস্যের গোপন স্থান। এখানে তোমার মনের অন্ধকারের মুখোমুখি হতে হবে। “
শ্যামল গ্রন্থটি নিয়ে বাবা মিঠু চরণের কাছে গেল। বাবা মিঠু চরণ গ্রন্থটি দেখার পর বললেন, “এই গ্রন্থটি প্রাচীন কাল থেকে কোনো একটি অশুভ শক্তির সাথে সম্পর্কিত। এটা সম্ভবত আমাদের গ্রামে অশান্তির কারণ।”
পরের দিন, বাবা মিঠু চরণ ও শ্যামল গ্রামবাসীদের নিয়ে মন্দিরের সামনে একটি সভা ডাকলেন। সেখানে সবাইকে জানানো হল যে, তারা একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান করবে যা এই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে। গ্রামবাসীরা সম্মতি দিল এবং প্রস্তুতি শুরু করল।
রাত নেমে এলো এবং মন্দিরের সামনে এক বিশাল পুজোর আয়োজন করা হলো। মন্দিরের সামনে আগুন জ্বালানো হলো এবং প্রার্থনা শুরু হল। সেই সময় মন্দিরের চারপাশে অদ্ভুত অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ল এবং অদৃশ্য শক্তির একটি ভয়ঙ্কর উপস্থিতি অনুভূত হতে লাগল।
বাবা মিঠু চরণ, শ্যামল ও গ্রামবাসীরা একত্রিত হয়ে প্রার্থনা করতে লাগল এবং মন্দিরের প্রতিটি কোণায় আগুনের তেজ পাঠাতে লাগল। রাতের অন্ধকারে প্রার্থনার মধ্যে একটা সুরভিত আলো দেখা দিল এবং মন্দিরের অদৃশ্য অন্ধকার কিছুটা আলোকিত হলো।
অবশেষে, সেই অশুভ শক্তির উপস্থিতি কমে গেল এবং গ্রামে শান্তি ফিরে আসল। গ্রামবাসীরা ধন্যবাদ জানালো বাবা মিঠু চরণ ও শ্যামলকে, যাদের সাহসিকতা ও সতর্কতা তাদের অশান্তি থেকে মুক্তি দিয়েছে।
কিন্তু বাবামিঠু চরণের মনে একটি প্রশ্ন রয়ে গেল— এই অশুভ শক্তি কেন তাদের গ্রামে এসেছিল? এর সাথে আরও রহস্য ছিল। বাবা মিঠু চরণের মনে একটি আশঙ্কা ছিল যে এই অশুভ শক্তি হয়তো ভবিষ্যতে আবার ফিরে আসবে।
গ্রামবাসীরা আবার শান্তিতে ফিরে গেল, কিন্তু গ্রামটি কখনোই সেই রাতে ঘটনার কথা ভুলতে পারল না। শ্যামল মন্দিরে গিয়ে গ্রন্থটি রেখে দিল, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আবার সেই অশুভ শক্তির মুখোমুখি হলে সেই গ্রন্থ সাহায্য করতে পারে।
এভাবেই, গোপালপুরের ছোট্ট গ্রামটি আবার শান্তি ফিরে পেল, তবে তার মধ্যে এক গোপন রহস্য রয়ে গেল যা কখনোই পুরোপুরি উদঘাটিত হলো না।


